
সিএসবি২৪ডটকম ॥
সেবাদানের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বেঁধে দেয়া নিয়ম মানছে না সেলফোন অপারেটররা। আর সেবার মান নিশ্চিতের দায়িত্বে থাকা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনও (বিটিআরসি) এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। এতে ভোগান্তি বাড়ছে প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবাগ্রহীতাদের, বাড়ছে বিভ্রান্তিও। বণিক বার্তা এক প্রতিবেদনে এ খবর প্রকাশ করেছে।
পত্রিকাটি বলছে, ট্যারিফ ও মার্কেটিং প্রমোশনের বিষয়ে ২০০৭ সালে বিটিআরসির জারি করা অন্তর্বর্তী নির্দেশনার ধারা-৪ অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক অপারেটরের নতুন প্রমোশনাল প্যাকেজের আওতায় সেবা নিতে চাইলে প্যাকেজ পরিবর্তনের জন্য তার কাছ থেকে কোনো অর্থ নেয়া যাবে না। নির্দেশনার ধারা-৫ অনুযায়ী, প্রিপেইড গ্রাহকের কাছ থেকে মাসিক নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে প্রমোশনাল কোনো প্যাকেজ চালু করতে পারবে না অপারেটররা।
তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার এ নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ রিচার্জের মাধ্যমে সহজে প্যাকেজ পরিবর্তনের সুবিধা চালু করেছে বেশ কয়েকটি অপারেটর। এতে বিভ্রান্তিতে পড়ছেন অনেক গ্রাহক। রিচার্জের মাধ্যমে প্যাকেজ পরিবর্তনের আগে গ্রাহকের সম্মতি নেয়ার সুযোগ না রাখায় নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ রিচার্জ করার পর অনিচ্ছাকৃতভাবেই অনেকে ভিন্ন প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান। বর্তমানে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ রিচার্জের মাধ্যমে প্যাকেজ পরিবর্তনের সুযোগ দিচ্ছে বেশ কয়েকটি সেলফোন অপারেটর। এসব প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে— এয়ারটেলের বিজয় ১৬, সবাই এক, পাওয়ার রিচার্জ ১১৫ ও রবির মুহূর্ত ৩১, অনন্যা ২৭ ও নবান্ন ৩৭। এছাড়া রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি প্যাকেজ।
রিচার্জের মাধ্যমে প্যাকেজ পরিবর্তনের এমনই এক অভিজ্ঞতার কথা জানান রাজধানীর মালিবাগ এলাকার বাসিন্দা শফিউল আলম। তিনি বলেন, ‘সাধারণত সেলফোনে ৫০ বা ১০০ টাকা রিচার্জ করি। তবে সম্প্রতি একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ রিচার্জ করতেই তার অজান্তে বিদ্যমান প্যাকেজ পরিবর্তন হয়ে যায়।’ এ বিষয়ে রবি আজিয়াটার মুখপাত্র মহিউদ্দিন বাবর বলেন, নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছে রবি। সব প্যাকেজই নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিয়ে চালু করা হয়েছে। গ্রাহকস্বার্থে গত বছর মোবাইল ফোন অপারেটরদের প্রতি নয়টি নির্দেশনা জারি করে বিটিআরসি। এতে বলা হয়, বিভিন্ন সেবার নিবন্ধন নিশ্চিত করার পাশাপাশি তা বন্ধের বিষয়েও গ্রাহককে সুস্পষ্টভাবে জানাতে হবে। এসএমএস ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গ্রাহককে এ তথ্য জানানোর বাধ্যবাধকতা দেয়া হয়।
বণিক বার্তা বলছে, ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে অর্থ পরিশোধ করতে হয়, এমন ইন্টারনেট প্যাকেজের সর্বোচ্চ ব্যবহার সীমা নির্দিষ্ট করে দিতে গত বছর উদ্যোগ নিয়েছিল বিটিআরসি। গ্রাহকদের অপ্রত্যাশিত বিলের আশঙ্কামুক্ত রাখতেই এ নির্দেশনা দেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবহারভিত্তিক প্যাকেজে মাসে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা নির্ধারণ করেছে গ্রামীণফোন। তবে অন্য অপারেটরদের এ ধরনের প্যাকেজে কোনো সীমা নির্ধারিত নেই। অপারেটরভেদে এ প্যাকেজের আওতায় থাকাকালীন গ্রাহককে প্রতি ১০ কিলোবাইটের জন্য এক-দেড় পয়সা করে দিতে হয়, যা অন্য যে কোনো প্যাকেজের তুলনায় উচ্চমূল্যের। ফলে ব্যবহারসীমা নির্ধারিত না থাকায় অনেক সময়ই অপ্রত্যাশিত বিলের মুখোমুখি হতে হয় গ্রাহকদের। একই ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে ডাটার পরিমাণ নির্ধারিত, এমন প্যাকেজের গ্রাহকদেরও। কারণ এসব প্যাকেজের নির্ধারিত পরিমাণ ডাটা শেষ হওয়ার পর ব্যবহার ভিত্তিতে বিল দিতে হয় তাদের।
পত্রিকাটি খোঁজ নিয়ে জানিয়েছে, থ্রিজি ক্লিক প্যাক নামে ৪ মেগাবাইটের ইন্টারনেট প্যাকেজ চালু রয়েছে গ্রামীণফোনের। প্যাকেজটির আওতায় নির্ধারিত ৪ এমবি ডাটা শেষ হলে পরবর্তী প্রতি ১০ কেবির জন্য ১ পয়সা হারে দিতে হয় গ্রাহকদের। তবে গ্রাহকরা বলছেন, স্মার্টফোনে প্যাকেজটি চালুর পর পরই নির্ধারিত ডাটা শেষ হয়ে যায়। পরবর্তীতে অতিরিক্ত ব্যবহারের জন্য উচ্চমূল্য প্রদান করতে হয় তাদের। এছাড়া প্যাকেজটি বন্ধ করার পরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবারো তা চালু হয়েছে, এমন অভিযোগ রয়েছে গ্রাহকদের।
গ্রামীণফোনের মুখপাত্র জানান, নির্ধারিত ডাটা শেষ হওয়ার পর গ্রাহকদের এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত ব্যবহারের জন্য প্রযোজ্য অর্থের বিষয়টিও জানানো হয় তাদের। ডাটাভিত্তিক প্যাকেজগুলোয় নির্ধারিত পরিমাণ ডাটা শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সীমা নির্ধারিত নেই বলে জানান তিনি। বিটিআরসি প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই শেষে দেশে ইন্টারনেটের গ্রাহক ৩ কোটি ৯৩ লাখ ৫৩ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে সিংহভাগই সেলফোন অপারেটরদের ডাটাভিত্তিক সেবার গ্রাহক। ছয় সেলফোন অপারেটরের ইন্টারনেট সেবার গ্রাহক ৩ কোটি ৭৮ লাখ ৪৬ হাজার। এছাড়া আইএসপি ও পিএসটিএনের ইন্টারনেট সেবায় ১২ লাখ ৩১ হাজার এবং ওয়াইম্যাক্স অপারেটরদের ২ লাখ ৭৬ হাজার গ্রাহক রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়মিত নজরদারির অভাবে অপারেটরদের নানা সেবায় ভোগান্তিতে পড়ছে গ্রাহক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের বিভিন্ন প্রচারণায় বিভ্রান্তিতেও পড়ছেন গ্রাহক। সেবার বিষয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তিতে বিটিআরসির একক সেবাদান কেন্দ্রও নেই। অপারেটরদের এ ধরনের সেবার বিষয়ে বিটিআরসির সচিব ও পরিচালক (মিডিয়া, আইটি ও ইঅ্যান্ডআই) মো. সরওয়ার আলম বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে অপারেটরদের অনুমোদিত বিভিন্ন সেবা পর্যবেক্ষণ করে বিটিআরসি। তবে জনবলের সীমাবদ্ধতার কারণে সব সেবা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না। সেবা সম্পর্কিত কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয় বিটিআরসি।
বণিক বার্তা কমিশন সূত্রে জানিয়েছে, অপারেটরদের সেবার মান নিশ্চিত করতে ২০০৭-১২ সাল পর্যন্ত সাতটি ভিন্ন ভিন্ন নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। তবে জারি করা এসব নির্দেশনা গ্রাহক পর্যায়ে সঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব নির্দেশনা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে প্রতারণার শিকার হচ্ছে গ্রাহক। ইন্টারনেটের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে আন্দোলনরত বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তি আন্দোলনের আহ্বায়ক জুলিয়াস চৌধুরী বলেন, বিশ্বব্যাপী একটি সেবামূলক খাত হিসেবে চিহ্নিত ইন্টারনেট ব্যবস্থা। প্রয়োজনেই এ সেবা গ্রহণ করবে মানুষ। থ্রিজিও মূলত ডাটাভিত্তিক একটি সেবা। তবে দেশে এটিকে ব্যবসায়িক করে ফেলা হয়েছে।: দৈনিক বণিক বার্তা
পাঠকের মতামত